সবাইকে কাঁদিয়ে না ফেরার দেশে চলে গেলেন সেই অগ্নিদগ্ধ নুসরাত।

This image about "nusrat death body"

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটে পাঁচ দিন ধরে মৃত্যুর সঙ্গে  পাঞ্জা লড়ে অবশেষে না ফেরার দেশে চলে গেলেন ফেনীর সোনাগাজীর অগ্নিদগ্ধ সেই মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রজিউন)।


অবশেষে আজ বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন নুসরাত কে মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিটের সমন্বয়ক ডা. সামন্ত লাল সেন নুসরাত এর মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

নুসরাতের শারীরিক অবস্থার একটু উন্নতি হলেই তাকে সিঙ্গাপুরে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন চিকিৎসকরা।  তার চিকিৎসা এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার সকল কাগজপত্র সিঙ্গাপুরে চিকিৎসকদের কাছে পাঠানো হয়েছিল।  তবে নুসরাত কে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে গেল চিকিৎসকদের,  আর বাঁচানো গেল না নুশরাতকে, সবাইকে কাঁদিয়ে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে চলে গেলেন নুসরাত।


নুসরাতের এই মৃত্যুতে কান্নায় ভেঙ্গে পড়েছে তার পরিবার। শুধু নুসরাতের পরিবারই নয় সারা দেশবাসী তার মৃত্যুতে অশ্রুসজল চোখে হত্যাকারীদের বিচারের অপেক্ষার প্রহর গুনছে।  ফেসবুক টুইটার ইত্যাদি সোশ্যাল মিডিয়া সহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে সবাই নুসরাতের হত্যার সুবিচার যাচ্ছে এবং হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবি করছে।


 গত ৬ এপ্রিল রোজ শনিবার সকাল ৯ টার দিকে আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথম পত্র পরীক্ষা দিতে সেই সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়ার ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে পরীক্ষার্থী দিতে যান নুসরাত। এরপর তার সহযোগীদের কৌশলে থাকে পাশের ভবনের ছাদে দেখে নেওয়া হয়। সেখানে বোরকা পরিহিত  ৪/৫ জন ব্যক্তি ওই  ছাত্রীর হাত পা বেধে শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। এতে প্রায় তার শরীরের 80 শতাংশ পুড়ে যায়।

পরে তার স্বজনরা ওই ছাত্রীকে উদ্ধার করে  প্রথমে সোনাগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে ফেনী সদর হাসপাতালে পাঠান।  সেদিনই সেখান থেকে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠানো হয়। পরদিন তার চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তৃপক্ষরা ৯ সদস্যের বোর্ড গঠন করেন।  পরীক্ষা কেন্দ্রে ছাত্রীর উপর এমন এমন নির্মমতায় উদ্বেগ প্রকাশ করে তার সার্বিক চিকিৎসার দায়িত্ব নেওয়ার কথা বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এবং পাশাপাশি হত্যাচেষ্টায় জড়িতদের গ্রেফতারের মাধ্যমে দ্রুত বিচারের আওতায় আনার নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী।


চিকিৎসাধীন নুসরাত জাহান রাফিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)  মঙ্গলবার লাইফ সাপোর্টে রেখেই অস্ত্রোপচার করা হয়। সকাল সোয়া ১০টা থেকে শুরু করে দুপুর ১২টা পর্যন্ত এই অস্ত্রোপচার চালানো হয়।  রাফির ফুসফুসকে কার্যকর করতে সিঙ্গাপুরের চিকিৎসকদের পরামর্শে এই অস্ত্রোপচার করা হয় বলে জানান চিকিৎসকরা।

সোমবার নুসরাত জাহান রাফি ‘ডাইং ডিক্লারেশন’ (মৃত্যুশয্যায় দেওয়া বক্তব্য) দেন। নুসরাত তার বক্তব্যে বলেছেন, ওড়না দিয়ে হাত বেঁধে তার শরীরে আগুন দেওয়া হয়। আগুনে ওড়না পুড়ে গেলে তার হাত মুক্ত হয়। বোরকা, নেকাব ও হাতমোজা পরা যে চার নারী তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেন, তাদের একজনের নাম সম্পা বলে জানান নুসরাত।


গত ২৭ মার্চ ওই ছাত্রীকে নিজ কক্ষে নিয়ে শ্লীলতাহানির অভিযোগে সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়ার ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাকে আটক করে পুলিশ। ওই ঘটনার পর থেকে তিনি কারাগারে। এ ঘটনায় ওই ছাত্রীর মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে সোনাগাজী মডেল থানায় মামলা করেন।

ওই ছাত্রীর স্বজনরা বলেন, ‌২৭ মার্চ মাদ্রাসার অধ্যক্ষ এস এম সিরাজ উদ দৌলা নুসরাতকে নিজের কক্ষে ডেকে নিয়ে শ্নীলতাহানি করেন। ওই ঘটনায় থানায় মামলা করেন তার মা শিরিন আক্তার। ওই মামলায় অধ্যক্ষ কারাগারে রয়েছেন। মামলা তুলে নিতে অধ্যক্ষের লোকজন হুমকি দিয়ে আসছিল বারবার।  আর মামলা না তুলে নেওয়াই সিরাজ উদদৌলার লোকজন  হত্যাকাণ্ড চালিয়েছে বলে দাবি করেন তার স্বজনরা। তারা জানান, আলিম পরীক্ষা চললেও আতঙ্কে স্বজনরা পরীক্ষা কেন্দ্রের কক্ষ পর্যন্ত পৌঁছে দিতেন। মামলা তুলে না নেওয়াতেই ক্ষিপ্ত হয়ে আগুনে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয় নুসরাতকে।



এ ঘটনায় সোমবার বিকেলে থানায় পাঠানো ছাত্রীর ভাইয়ের লিখিত অভিযোগকে মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। মামলায় চারজন অজ্ঞাতনামা ছাত্রীসহ তাদের সহযোগীদের আসামি করা হয়। 

এদিকে সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়ার ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলাকে রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। নুসরাত হত্যার সুবিচার দেওয়ার জন্য সর্বোচ্চ আশ্বাস দিচ্ছে পুলিশ।ঘটনার দিন থেকে শুরু করে সোমবার পর্যন্ত থানা-পুলিশ ও জেলা গোয়েন্দা পুলিশ যৌথ অভিযান চালিয়ে উপজেলার বিভিন্ন স্থান থেকে এই সাতজনকে আটক করেছে।

আটক ব্যক্তিরা হলেন: ওই মাদ্রাসার ইংরেজির প্রভাষক আফছার উদ্দিন (৩৩), মাদ্রাসার নৈশ প্রহরী মো. মোস্তফা (৩৮), আলিম পরীক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম (২২), অফিস সহকারী নুরুল আমিন (৫০), সাইদুল ইসলাম (২১), জসিম উদ্দিন (৩০) এবং স্থানীয় আলাউদ্দিন (২৫)। তবে এঁদের মধ্যে আফছার উদ্দিন ও আরিফুল ইসলামকে আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।



সবার আগে সকল খবর পেতে এবং শিক্ষামূলক ও অনলাইন আর্নিং সম্পর্কিত তথ্য জানতে প্রতিদিন এখানে ভিজিট করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *